মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা : স্পেনে পর্যটকের রেকর্ড হিড়িক
ঢাকাঃ মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার কারণে বিশ্বজুড়ে পর্যটকরা ভ্রমণের পরিকল্পনা ও গন্তব্য পরিবর্তন করছেন।যুদ্ধের কারণে অনিরাপদ হয়ে ওঠা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এড়িয়ে তারা এখন বেছে নিচ্ছেন ইউরোপীয় দেশ স্পেনকে। ফলে স্পেনে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আগমন এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। দেশটির পর্যটন খাত এখন স্মরণকালের সবচেয়ে বড় প্রবৃদ্ধির মুখ দেখছে।প্রতিবেদনে বলা হয়, হোটেলের ছাদ থেকে স্পেনের বেনিডম শহরের দিকে তাকালে চোখে পড়ে সারিবদ্ধ বহুতল ভবন ও বিশাল সমুদ্রসৈকত।স্থানীয় পর্যটন সমিতির সভাপতি ফেদে ফুস্টার বলেন, ‘সব গুণ ও ত্রুটি মিলিয়েই শহরকে নিয়ে আমরা গর্ব করি। এটি সুযোগের একটি বড় জায়গা।’"ফুস্টার জানান, তার পরিবার ১৯৫০-এর দশকে ভূমধ্যসাগরীয় এ শহরে প্রথম হোটেল তৈরি করেছিল।বেনিডমের জনসংখ্যা ৭৭ হাজার। তবে গ্রীষ্মের মৌসুমে এ সংখ্যা প্রায় পাঁচ গুণ বেড়ে যায়। স্পেনের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র হওয়ায় মানুষের ঢল নামে এখানে।কভিড-১৯ মহামারীর সময়ে বেনিডমের মতো পর্যটন কেন্দ্রগুলো পুরোপুরি জনশূন্য হয়ে পড়েছিল। স্থবির হয়ে গিয়েছিল পুরো স্পেনের পর্যটন শিল্প। তবে মহামারী-পরবর্তী সময়ে এ খাতে এক অবিশ্বাস্য পুনরুদ্ধার দেখা গেছে। প্রতি বছরই দেশটিতে বিদেশী পর্যটকদের আগমন আগের রেকর্ড ভাঙছে। ২০২৫ সালে স্পেনে যান রেকর্ড ৯ কোটি ৭০ লাখ পর্যটক।বর্তমানে ফ্রান্সের পরই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পর্যটন গন্তব্য স্পেন। ফুস্টার বলেন, ‘আমি মনে করি, ২০২৬ সাল স্পেনের জন্য দারুণ একটি বছর হবে। আমরা এবার ১০ কোটি পর্যটকের মাইলফলক ছোঁয়ার কথা ভাবছি। এভাবে প্রবৃদ্ধি বজায় থাকলে খুব দ্রুত বিশ্বের এক নম্বর পর্যটন দেশে পরিণত হবে স্পেন।’এর আগে শিল্প বিশেষজ্ঞদের ধারণা ছিল, ২০২৬ সালে স্পেনের পর্যটন খাতে সাধারণ মানের প্রবৃদ্ধি হতে পারে। কিন্তু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের কারণে পরিস্থিতি বদলে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র দুবাই কিংবা পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের তুরস্ক ও সাইপ্রাসের মতো দেশগুলোর বিকল্প হিসেবে পর্যটকরা এখন স্পেনকে বেছে নিচ্ছেন।ফুস্টার অতীতের অভিজ্ঞতার কথা মনে করে জানান, সংকট, সামরিক হামলা বা যুদ্ধের সময় স্পেনে বুকিং সবসময়ই বেড়ে যায়।"২০১১ সালে ‘আরব বসন্ত’ আন্দোলনের সময়ও স্পেনে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।মাদ্রিদের কমপ্লুটেন্স ইউনিভার্সিটির ভূগোলের শিক্ষক ফ্রান্সিসকো ফেমেনিয়া-সেরা বলেন, ‘ভূমধ্যসাগরের পূর্ব অংশ বা মধ্যপ্রাচ্যে কোনো সংকট তৈরি হলে পর্যটকদের কাছে স্পেন একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচিত হয়।"কম খরচের কারণে যে পর্যটকরা সাধারণত তুরস্ক বা মিসরে যেতেন, তাদের একটি বড় অংশ এখন স্পেনে চলে এসেছেন।’স্পেনের সরকারি পর্যটন সংস্থা বলছে, চলতি বছরের এপ্রিলে দেশটিতে ৯১ লাখ আন্তর্জাতিক পর্যটক গিয়েছেন, যা এপ্রিলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এটি ২০২৫ সালের এপ্রিলের তুলনায় ৫ দশমিক ২ শতাংশ বা ৪ লাখ ৫০ হাজার জন বেশি।অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি অবনতি হওয়ায় দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রী সংখ্যা ব্যাপক হ্রাস পেয়েছে। গত মার্চে সেখানে যাত্রী পরিবহন ৬৬ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে বহু ফ্লাইট বাতিল হয়েছে ও নতুন বুকিং কমে গেছে।স্পেনের অর্থনীতিতে পর্যটন খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির মোট জিডিপির ১৩ শতাংশ সরাসরি যায় এ খাত থেকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় স্পেনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও যুক্তরাজ্যের মতো পরাশক্তিদের ছাড়িয়ে গেছে।তবে স্পেনের পর্যটন খাতের সামনে একটি সম্ভাব্য বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম প্রতিনিয়ত বাড়ছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে উড়োজাহাজ ভাড়া ও ভ্রমণ খরচ বেড়ে যেতে পারে। ফলে ইউরোপের নাগরিকদের বিদেশ ভ্রমণের প্রবণতা কিছুটা কমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পর্যটন খাতসংশ্লিষ্টরা।