নিরাপত্তাহীনতায় ঝুঁকিতে কক্সবাজারের পর্যটন
ঢাকাঃ দেশের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র কক্সবাজারে পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় উন্নতি হয়নি।২০২৩ সালের ডিসেম্বরে রেলসংযোগ চালুর পর পর্যটকের আগমন বেড়েছে। বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে প্রতিদিন ৪ জোড়া ট্রেন চলাচল করছে। ২৬ অক্টোবর নতুন একটি আন্তঃনগর ট্রেন চালুর কথা রয়েছে। তবে ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ, লেভেল ক্রসিংয়ে অব্যবস্থাপনা, মহাসড়কে দুর্ঘটনা এবং সমুদ্রে ডুবে পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।২০২৫ সালে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে ১০৬টি দুর্ঘটনায় ১৩৪ জন নিহত হন। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬১টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৭৪ জন।অন্যদিকে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রেলপথে ৫০টি পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় শতাধিক যাত্রী আহত হয়েছেন। এ সময়ে ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছেন ১০৪ জন।২০১৬ থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সৈকতে পানিতে ডুবে ৭০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে ১ হাজার ৭৭ জনকে উদ্ধার করেছে সেফগার্ড। বর্তমানে ২৭ জন লাইফগার্ড দিয়ে বিস্তীর্ণ সৈকতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।জেলার উখিয়া উপজেলার ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতের খুব কাছেই বাঁশ-কাঠ ও ইট-সিমেন্ট মিলিয়ে তৈরি রিসোর্ট মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে।রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তা সনদ ছিল না, যদিও কর্তৃপক্ষকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল।সংশ্লিষ্টদের মতে, অনুমোদনহীন পর্যটন স্থাপনা, অপ্রতুল অগ্নিনির্বাপণ জনবল এবং সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা পরিস্থিতিকে ঝুঁকিপূর্ণ করছে।মেরিন ড্রাইভের ৮০ কিলোমিটারে প্রায় ২,৫০০ স্থাপনা রয়েছে। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ১৫০টি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত নোটিস দিয়েছে।জেলা প্রশাসনের কার্যালয়, হোটেল-মোটেল মালিক সমিতি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে ৫০০-৬০০টি হোটেল-মোটেল-রিসোর্টের তথ্য থাকলেও বাস্তবে এ সংখ্যা আরো বেশি।কক্সবাজার হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম শিকদার বলেন, ‘যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে পর্যটক আগমন বাড়লেও কোনো সংস্থাই প্রকৃত অর্থে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে পারছে না।তার মতে, সরকার উদ্যোগ নিলেই কক্সবাজারের পর্যটন ও পর্যটনসেবার মান ধরে রাখার পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা জোরদারে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব।ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারের বিভিন্ন স্টেশনে চালক ও ফায়ার ফাইটারের সংখ্যা সীমিত। কক্সবাজার শহরের মূল স্টেশনে ৩৫ জন জনবল থাকলেও বড় অগ্নিকাণ্ড মোকাবেলায় এ সক্ষমতা অপ্রতুল।সংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যটন নগরীর মানুষ ও অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত জনবল, যানবাহন ও অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম প্রয়োজন।বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের পরিচালক আবু সেলিম মাহমুদ উল হাসান বলেন, কক্সবাজারের পর্যটন খাতে একক তদারকি সংস্থা না থাকায় বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে জেলাভিত্তিক ট্যুরিজম বোর্ডের কার্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা করছে সরকার।জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, কর্তৃপক্ষ মাস্টারপ্ল্যান সংশোধন, সমন্বিত তদারকি, পর্যাপ্ত লাইফগার্ড নিয়োগ এবং অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। কার্যকর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ছাড়া পর্যটকের নিরাপত্তা ও সেবার মান নিশ্চিত করা কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।