ইউরোপজুড়ে উড়োজাহাজে বোমা আতঙ্ক


ঢাকাঃ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে একের পর এক বোমা হামলার হুমকিতে চরম নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অন্তত ৭টি ফ্লাইট এবং ইসরায়েলগামী একটি প্রমোদতরিতে বোমা রাখার হুমকি দেওয়া হয়।
এসব ঘটনায় কয়েকটি বিমানবন্দরে জরুরি তল্লাশি চালানো হয়েছে। এমনকি পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশর একটি বিমানবন্দরের কার্যক্রমও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। তবে তল্লাশি চালিয়ে কোথাও বিস্ফোরক বা বোমার সন্ধান পাওয়া যায়নি।
বুধবার (৪ নভেম্বর) আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, হুমকির মুখে পড়া সব উড়োজাহাজই নিরাপদে অবতরণ করেছে।
আক্রান্ত উড়োজাহাজগুলোর মধ্যে ছিল আয়ারল্যান্ডের স্বল্পমূল্যের বিমান সংস্থা রায়ানএয়ার, উইজ এয়ার, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এয়ারলাইনস এবং পোল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় উড়োজাহাজ সংস্থা লটের ফ্লাইট। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে পড়ে রায়ানএয়ারের ৪টি ফ্লাইট।
পোল্যান্ডে ওয়ারশগামী ২টি ফ্লাইট বোমা হামলার হুমকি পায়। কোপেনহেগেন থেকে আসা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট ওয়ারশ শপিন বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করে। পরে উড়োজাহাজটি পরীক্ষা করতে বিমানবন্দরের একটি রানওয়ে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
অন্যদিকে, লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে আসা লটের একটি ফ্লাইটকে ওয়ারশর পরিবর্তে মডলিন বিমানবন্দরে পাঠানো হয়। সেখানেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে উড়োজাহাজটিতে কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। পরে বিমানবন্দরটির স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হয়।
ইতালিতে ডাবলিন থেকে রোমগামী রায়ানএয়ারের একটি ফ্লাইটকে পাহারা দিয়ে নিয়ে আসে দেশটির বিমানবাহিনীর দুটি ইউরোফাইটার যুদ্ধবিমান।
রোমের ফিউমিচিনো বিমানবন্দরে স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে উড়োজাহাজটি নিরাপদে অবতরণ করে। এর আগে লিসবন থেকে আসা রায়ানএয়ারের আরেকটি ফ্লাইটেও বোমা শনাক্তের বিশেষ তল্লাশি চালানো হয়। যাত্রী, লাগেজ ও উড়োজাহাজ পরীক্ষা করে সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায়নি।
স্পেনেও ম্যানচেস্টার থেকে আসা রায়ানএয়ারের একটি ফ্লাইটে বোমা থাকার খবর পেয়ে জরুরি নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করে দেশটির বিমানবন্দর পরিচালনাকারী সংস্থা এইনা। উড়োজাহাজটি মুরসিয়া বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করে।
এ ছাড়া ইতালির বার্গামো থেকে সোফিয়াগামী উইজ এয়ারের একটি ফ্লাইট এবং ডাবলিন থেকে সোফিয়াগামী রায়ানএয়ারের আরেকটি ফ্লাইটও হুমকির মুখে পড়ে। বুলগেরিয়ার রাজধানী সোফিয়ায় অবতরণের পর উড়োজাহাজ দুটিতে তল্লাশি চালানো হয়। তবে কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাজ্যের লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, মঙ্গলবার হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়া বা সেখানে অবতরণের কথা ছিল— এমন ৪টি উড়োজাহাজে হুমকির তথ্য পাওয়া যায়। ম্যানচেস্টার বিমানবন্দরের একটি ফ্লাইট নিয়েও সতর্কবার্তা আসে। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কোনো নিরাপত্তাঝুঁকি শনাক্ত হয়নি।
একই দিন রাতে গ্রিসের সাইরোস দ্বীপের কাছে নোঙর করা পানামার পতাকাবাহী ‘ক্রাউন আইরিস’ নামের একটি প্রমোদতরিতেও বোমা হামলার হুমকি দেওয়া হয়। এতে প্রায় ১ হাজার ৫০০ যাত্রী ও নাবিক ছিলেন। ইসরায়েলের হাইফা বন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করা জাহাজটি থেকে সবাইকে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে তল্লাশি চালিয়ে কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। এরপর জাহাজটির যাত্রা পুনরায় শুরুর কথা জানানো হয়।
এর আগে সোমবার লন্ডনের লুটন বিমানবন্দর থেকে সোফিয়াগামী উইজ এয়ারের একটি ফ্লাইট মাঝআকাশে বোমা হামলার হুমকি পায়। পরে সেটিকে হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে সরিয়ে নেওয়া হয়।
হাঙ্গেরির প্রতিরক্ষামন্ত্রী রোমুলুস রুসিন-সেন্দি জানান, ন্যাটোর আকাশ প্রতিরক্ষা সতর্কতা ব্যবস্থার মাধ্যমে বিষয়টি জানার পর দেশটির গ্রিপেন যুদ্ধবিমান দ্রুত আকাশে উড়ে উড়োজাহাজটিকে নিরাপদে অবতরণে সহায়তা করে।
‘হাইব্রিড হামলার’ আশঙ্কা
ইউরোপজুড়ে এসব হুমকির ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী দায় স্বীকার করেনি। কোনো দেশকেও সরাসরি দায়ী করেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে ইউরোপীয় কর্মকর্তারা সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া ও ইরানের বিরুদ্ধে সাইবার হামলা, নাশকতা এবং বিভিন্ন ধরনের ‘হাইব্রিড হামলায়’ জড়িত থাকার অভিযোগ করে আসছেন। যদিও মস্কো ও তেহরান উভয়েই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
চলতি সপ্তাহে ইউরোপের কয়েকটি দেশের সুপারমার্কেটের ফ্রিজ অচল করে দেওয়ার মতো সাইবার হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এ ধরনের ভুয়া বোমা হামলার হুমকিও কম খরচে পরিচালিত এবং দায় অস্বীকার করা যায়— এমন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কৌশলের অংশ হতে পারে।
উড়োজাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ওসপ্রে ফ্লাইট সলিউশনের কর্মকর্তা রাইস জোনস বলেন, এক দিনে ৭টি নিশ্চিত বোমা হামলার হুমকিতে একাধিক ফ্লাইট আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ব্যতিক্রমী।
তার মতে, নির্দিষ্ট কোনো দেশ, উড়োজাহাজ সংস্থা কিংবা রুটকে লক্ষ্য না করে সামগ্রিক উড়োজাহাজ চলাচল ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি করাই এসব হুমকির উদ্দেশ্য হতে পারে।










