ঢাকাঃ হিমালয়ের
পরিবর্তন শুধু নেপালের প্রাকৃতিক পরিবেশকেই বদলে দিচ্ছে না, এর বড় প্রভাব পড়ছে দেশটির
অর্থনীতিতেও। বিশেষ করে পর্যটন ও পর্বতারোহণ নির্ভর অর্থনীতি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে
ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সাম্প্রতিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনাও সেই ঝুঁকিকে নতুন করে
সামনে এনেছে।
বিশ্বব্যাংকের
হিসাবে, নেপালের মোট অর্থনীতির ৬ দশমিক ১ শতাংশ আসে পর্যটন খাত থেকে। ২০২৩ সালে এ খাতে
প্রায় ১২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ছিল, যা দেশটির মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ১৫ শতাংশ।
ফলে পাহাড়, ট্রেকিং ও পর্বতারোহণের ওপর নির্ভরশীল পর্যটন ব্যাহত হলে এর প্রভাব পড়ে
সরাসরি স্থানীয় মানুষের আয়-রোজগারেও।
২০২৫ সালে
১১ লাখ ৬০ হাজারের বেশি আন্তর্জাতিক পর্যটক নেপাল সফর করেন। তাদের মধ্যে ১ লাখ ৬৫ হাজারের
বেশি পর্যটকের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ট্রেকিং ও পর্বতারোহণ। এই বিপুল পর্যটককে ঘিরে দেশটিতে
গড়ে উঠেছে ৩ হাজারের বেশি ট্রেকিং এজেন্সি। পাশাপাশি গাইড, পোর্টার, হোটেল, লজ, রেস্তোরাঁ,
পরিবহন ও হেলিকপ্টার সেবার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বিপুলসংখ্যক মানুষ।
পর্বতারোহণ
থেকেও নেপাল উল্লেখযোগ্য রাজস্ব পায়। চলতি বছরের বসন্ত মৌসুমে ৩১টি পর্বতে আরোহণের
জন্য ১ হাজার ১৯৫ জন পর্বতারোহী অনুমতি নেন। এসব অনুমতি থেকে সরকারের আয় হয়েছে প্রায়
৯০ লাখ ডলার রয়্যালটি। শুধু মাউন্ট এভারেস্টে বিদেশি পর্বতারোহীদের বসন্তকালীন আরোহণের
অনুমতিপত্রের মূল্য ১৫ হাজার ডলার।
কিন্তু জলবায়ু
পরিবর্তনের প্রভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অভিজ্ঞ
পর্বতারোহীরা বলছেন, গত দুই দশকে হিমালয়ের চেহারায় বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। এভারেস্টের
খুম্বু আইসফলেও বরফের ফাটল ও কাঠামো আগের তুলনায় বদলে গেছে।
২০০৪ সালে
খুম্বু আইসফলের অসংখ্য ফাটল ও বিপজ্জনক অংশ পার হতে একাধিক অ্যালুমিনিয়ামের মই ব্যবহার
করতে হতো। অথচ চলতি বছর কিছু অংশে মাত্র দুটি জায়গায় মই ব্যবহারের প্রয়োজন হয়েছে। পর্বতারোহীদের
মতে, বরফের কাঠামোর এই পরিবর্তন হিমালয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের গভীর প্রভাবেরই একটি দৃশ্যমান
চিত্র।
এর সঙ্গে
যুক্ত হয়েছে অতিবৃষ্টি, বন্যা ও ভূমিধসের বাড়তি ঝুঁকি। নেপালের পাহাড়ি এলাকায় আকস্মিক
বন্যা ও ভূমিধস হলে ট্রেকিং রুট, সড়ক, সেতু এবং পর্যটন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে
একদিকে পর্যটকদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে, অন্যদিকে পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল স্থানীয়
মানুষের আয়ও অনিশ্চিত হয়ে যায়।
তবে প্রযুক্তির
ব্যবহার কিছুটা ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করছে। পর্বতারোহীরা এখন উন্নত আবহাওয়া পূর্বাভাস,
জিপিএস, তুষারধস শনাক্তকারী যন্ত্র, হালকা সরঞ্জাম এবং ড্রোন ব্যবহার করছেন। দুর্গম
এলাকায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে বিপজ্জনক এলাকা আগেভাগে পর্যবেক্ষণ—বিভিন্ন
কাজে ড্রোনের ব্যবহার বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের
মতে, নেপালি শেরপা ও অন্যান্য স্থানীয় কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ড্রোন বিশেষভাবে
গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ বিদেশি পর্বতারোহীদের তুলনায় স্থানীয় কর্মীদের ঝুঁকিপূর্ণ
বরফাঞ্চল বারবার পার হতে হয়। তাঁবু, অক্সিজেন, খাবার ও অন্যান্য সরঞ্জাম পৌঁছে দিতে
একই বিপজ্জনক পথ তাদের একাধিকবার অতিক্রম করতে হয়।
শরতের ট্রেকিং
মৌসুম সামনে রেখে নেপালের পর্যটন খাত আবারও ব্যস্ত হয়ে উঠছে। অনেক অভিযান ইতোমধ্যে
নির্ধারিত হয়েছে। গাইড, পোর্টার, হোটেল ও লজ মালিকরা এই মৌসুমের আয়ের ওপর নির্ভর করছেন।
কিন্তু সাম্প্রতিক বন্যা-ভূমিধস এবং পরিবর্তিত জলবায়ু তাদের সামনে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি
করছে।
মার্কিন পর্বতারোহী
ডেভ ওয়াটসনের মতে, এভারেস্টের চূড়ায় বরফের পরিমাণ কমে যাওয়ার বিষয়টি শুধু হিমালয়ের
পরিবর্তনের সংকেত নয়, এটি পুরো পৃথিবীর পরিবর্তনের একটি বড় সতর্কবার্তা। তাঁর ভাষায়,
পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ যদি এতটা বরফ হারায়, তাহলে পৃথিবীর কোনো স্থানই এই পরিবর্তনের
বাইরে নেই।
নেপালের জন্য
তাই হিমালয় এখন শুধু পর্যটনের আকর্ষণ নয়; এটি অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও মানুষের জীবিকার
সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি সম্পদ। আর সেই হিমালয়ের দ্রুত পরিবর্তন ও সাম্প্রতিক বন্যা-ভূমিধস
দেখিয়ে দিচ্ছে, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় পর্যটন অবকাঠামোর পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা
ও অভিযোজন সক্ষমতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।