বৈশ্বিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে উড়োজাহাজ খাত


ঢাকাঃ শুধু যাত্রী পরিবহন নয়, পণ্য পরিবহন, কর্মসংস্থান, পর্যটন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত খাতটি। ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতিতে উড়োজাহাজ খাতের অবদান দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারে।
আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ পরিবহন সংস্থা (আইএটিএ) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
সংস্থাটি বলেছে, বৈশ্বিক উড়োজাহাজ খাত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৮ কোটি ৬৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত। চলতি বছর এ খাত প্রায় ৫২০ কোটি যাত্রীকে সেবা দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সময় আকাশপথে পণ্য পরিবহনের পরিমাণ ৭ কোটি ১৬ লাখ টনে পৌঁছতে পারে।
উড়োজাহাজ খাতের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বোঝা যায় পণ্য পরিবহনের হিসাব থেকেও। আইএটিএর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ৮ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য আকাশপথে পরিবহন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চমূল্যের ও দ্রুত সরবরাহ প্রয়োজন এমন নানা ধরনের পণ্য। ফলে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে বিমান পরিবহনের সম্পর্ক ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
আইএটিএ বলছে, বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় ৩ দশমিক ৯ শতাংশের সঙ্গে বিমান পরিবহন খাতের সরাসরি ও পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে যাত্রী পরিবহন আগের বছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে।
চলতি বছরও যাত্রীসংখ্যা বাড়ার প্রত্যাশা করছে উড়োজাহাজ সংস্থাগুলো। তবে এ প্রবৃদ্ধির সঙ্গে কিছু ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সরবরাহ ব্যবস্থায় বাধা, উড়োজাহাজ সরবরাহে বিলম্ব ও টেকসই জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা এখন খাতটির বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
২০২৬ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫২০ কোটি যাত্রীকে উড়োজাহাজ সেবা দেয়ার প্রত্যাশা করছে আইএটিএ। যাত্রীসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে উড়োজাহাজ সংস্থাগুলোর সক্ষমতাও বাড়ছে। তবে বিশ্বের সব অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি সমান নয়।
ভ্রমণবিষয়ক তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ওএজির গত আগস্টের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে উড়োজাহাজ সংস্থাগুলোর মোট আসন সক্ষমতা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। এতে নতুন করে ১ কোটি ৪২ লাখ আসন যুক্ত হয়েছে।
অঞ্চলভেদে চিত্র বেশ ভিন্ন। মধ্যপ্রাচ্যে বিমান চলাচলের সক্ষমতা সবচেয়ে বেশি কমেছে। গত বছরের আগস্টের তুলনায় এ অঞ্চলে আসন সংখ্যা কমেছে ১৪ লাখ ৭০ হাজার। শতকরা হিসাবে এ হ্রাস ৫ দশমিক ৭ শতাংশ।
ওএজি এর কারণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিতিশীলতাকে উল্লেখ করেছে। যুদ্ধের ফলে ফ্লাইট বাতিল, বিকল্প পথে উড়োজাহাজ পরিচালনা ও ফ্লাইট বিলম্বের ঝুঁকি বাড়ছে।
শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ক্যারিবীয় অঞ্চল, দক্ষিণ-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও দক্ষিণ এশিয়ায়ও বিমান পরিবহনের সক্ষমতা কমেছে। এসব অঞ্চলে সক্ষমতা যথাক্রমে ৪ দশমিক ৬, ২ দশমিক ১ ও ১ শতাংশ কমেছে।
বিমান পরিবহন খাতের জন্য মধ্যপ্রাচ্য এখন বড় ধরনের অনিশ্চয়তার উৎস হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে দীর্ঘপথের আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনাকারী উপসাগরীয় উড়োজাহাজ সংস্থাগুলোয় এর প্রভাব দেখা গেছে।
এমিরেটস ও কাতার এয়ারওয়েজের আন্তর্জাতিক আসন-কিলোমিটার বা এএসকে যথাক্রমে ৫ দশমিক ৪ ও ৫ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে। একটি উড়োজাহাজ সংস্থা কত দূরত্বে কত আসন পরিবহনের সক্ষমতা রাখছে, তা পরিমাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো এএসকে।
সব উপসাগরীয় সংস্থাগুলোর সক্ষমতা কমেনি। ইতিহাদ এয়ারওয়েজের এএসকে ১২ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে।
পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে উড়োজাহাজের জ্বালানির (জেট ফুয়েল) দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। ফলে চলতি বছর বিশ্বজুড়ে উড়োজাহাজ সংস্থাগুলোর মুনাফা ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
উড়োজাহাজ পরিবহন খাতের আন্তর্জাতিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইএটিএ) সর্বশেষ পূর্বাভাসে এ তথ্য জানায়।
বিশ্বের ৮৫ শতাংশ আকাশপথ নিয়ন্ত্রণকারী ৩৭০টি উড়োজাহাজ সংস্থার প্রতিনিধিত্ব করে আইএটিএ। সংগঠনটির আর্থিক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালে বিশ্বজুড়ে উড়োজাহাজ সংস্থাগুলোর সম্মিলিত নিট মুনাফা হতে পারে ২ হাজার ৩০০ কোটি ডলার।
অন্যদিকে এর আগে এ মুনাফার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৪ হাজার ১০০ কোটি ডলার। এমনকি গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালেও এ খাতের মুনাফা ছিল ৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। সে তুলনায় চলতি বছর মুনাফা প্রায় অর্ধেকে নেমে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উড়োজাহাজ পরিবহন খাতের মাধ্যমে জাতীয় আয়ে অবদানের ভিত্তিতে বিশ্বের বড় বাজারগুলোর তালিকাও দেয়া হয়েছে আইএটিএর প্রতিবেদনে।
এ তালিকায় শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির জিডিপিতে আকাশপথের এ পরিবহন খাতের অবদান ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চীন। দেশটির অর্থনীতিতে বিমান পরিবহনের অবদান ২৫ হাজার ৩৬০ কোটি ডলার। এরপর রয়েছে স্পেন। দেশটির জিডিপিতে এ খাতের অবদান ১৭ হাজার ২৯০ কোটি ডলার।
শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় এরপর রয়েছে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান, ইতালি, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব। যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে বিমান পরিবহনের অবদান ১৬ হাজার ৭০ কোটি ডলার। ফ্রান্সে ১৪ হাজার ৪৭০ কোটি ও জার্মানিতে ১৪ হাজার ২৭০ কোটি ডলার।
বিশ্লেষকদের মতে, যেসব দেশে বড় বিমানবন্দর, শক্তিশালী এয়ারলাইনস ও বড় পর্যটন ও ব্যবসা খাত রয়েছে, সেখানে জাতীয় অর্থনীতিতে উড়োজাহাজ পরিবহনের ভূমিকা তুলনামূলক বেশি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, উড়োজাহাজ পরিবহনের প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশগত চাপও বাড়ছে। কার্বন নিঃসরণ কমানো এখন খাতটির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। ২০৫০ সালের মধ্যে নিট শূন্য কার্বন নিঃসরণের লক্ষ্যে পৌঁছতে উড়োজাহাজ খাতকে বিপুল পরিমাণ টেকসই বিমান জ্বালানি বা এসএএফ ব্যবহার করতে হবে।
আইএটিএর হিসাবে, এ লক্ষ্য অর্জনে প্রতি বছর প্রায় ৫০ কোটি টন এসএএফ প্রয়োজন হবে। কিন্তু বর্তমানে এ জ্বালানির উৎপাদন সে মাত্রার তুলনায় অনেক কম। তাই ভবিষ্যতে এসএএফ উৎপাদন বাড়ানো ও এর সরবরাহ নিশ্চিত করা বিমান খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
একদিকে যাত্রীসংখ্যা বাড়ছে। অন্যদিকে পণ্য পরিবহনও বাড়ছে। এর সঙ্গে আবার জ্বালানি ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ যুক্ত হচ্ছে। ফলে বিমান পরিবহন খাতকে একই সঙ্গে সক্ষমতা বাড়ানো ও পরিবেশগত দায় কমানোর পথ খুঁজতে হবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
আইএটিএর প্রতিবেদনে উড়োজাহাজ পরিবহনকে বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিপুলসংখ্যক ফ্লাইট পরিচালিত হওয়ায় একটি দুর্ঘটনাও সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিসংখ্যানে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর প্রায় ৪ কোটি ফ্লাইট পরিচালিত হয়। এত বিপুলসংখ্যক ফ্লাইটের মধ্যে একটি দুর্ঘটনাও নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। তাই যাত্রী সংখ্যা ও ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।










